উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টন নিয়ে ১০টি প্রশ্নের উত্তর
বাবার সম্পত্তিতে মেয়ের ভাগ কত, স্ত্রী কতটুকু পান, ওয়ারিশান সনদ কোথায় মেলে, মৃত্যুর আগে সম্পত্তি লিখে দেওয়া — উত্তরাধিকার আইনের সবচেয়ে জিজ্ঞাসিত ১০ প্রশ্নের উত্তর।
সম্পত্তি বণ্টনের বিরোধই বাংলাদেশের আদালতগুলোর সবচেয়ে বড় মামলার উৎস — অথচ ভাগের নিয়মগুলো আগে থেকে জানা থাকলে অধিকাংশ বিরোধ জন্মই নেয় না। সবচেয়ে বেশি জিজ্ঞাসিত ১০টি প্রশ্নের উত্তর এখানে।
সম্পত্তি বুঝে নেওয়ার পরের ধাপ
- নামজারি (মিউটেশন) করার নিয়ম — ওয়ারিশসূত্রে পাওয়া জমি রেকর্ডে আনতে
- খতিয়ান-পর্চা তোলা ও যাচাই
- আইনি সহায়তা: ১৬৪৩০ (সরকারি লিগ্যাল এইড)
সাধারণ প্রশ্নোত্তর
বাবার সম্পত্তিতে মেয়ে কতটুকু ভাগ পান?
মুসলিম ফারায়েজ অনুযায়ী মেয়ে ছেলের অর্ধেক ভাগ পান — যেমন এক ছেলে এক মেয়ে থাকলে সম্পত্তি ৩ ভাগ হয়ে ছেলে ২, মেয়ে ১ ভাগ। শুধু মেয়ে থাকলে (ছেলে না থাকলে) এক মেয়ে অর্ধেক, একাধিক মেয়ে মিলে দুই-তৃতীয়াংশ পান; বাকিটা যায় অন্য ওয়ারিশদের কাছে।
স্বামীর সম্পত্তিতে স্ত্রীর ভাগ কত?
সন্তান থাকলে স্ত্রী পান এক-অষ্টমাংশ (১/৮), সন্তান না থাকলে এক-চতুর্থাংশ (১/৪)। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই ভাগটুকুই তাদের মধ্যে সমান ভাগ হয়। মনে রাখুন — এর সঙ্গে স্ত্রীর অপরিশোধিত দেনমোহরও সম্পত্তি থেকে ঋণ হিসেবে আগে পরিশোধযোগ্য।
মা-বাবা কি জীবিত সন্তানের সম্পত্তি পান?
হ্যাঁ — মৃতের সন্তান থাকলে বাবা ও মা প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ (১/৬) করে পান। সন্তান না থাকলে মায়ের ভাগ বেড়ে এক-তৃতীয়াংশ হতে পারে এবং বাবা অবশিষ্টভোগী হিসেবে বাকিটা পান।
দাদা জীবিত থাকতে বাবা মারা গেলে নাতি-নাতনি কি ভাগ পায়?
পায় — ১৯৬১ সালের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশের ৪ ধারায় মৃত ছেলে/মেয়ের সন্তানরা তাদের বাবা/মা বেঁচে থাকলে যা পেতেন, সেই ভাগ পায়। উপমহাদেশের পুরনো নিয়মে বঞ্চিত হতো — বাংলাদেশের আইনে এই সুরক্ষা আছে।
ওয়ারিশান সনদ কোথায়, কীভাবে তুলব?
মৃতের স্থায়ী ঠিকানার ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি করপোরেশন থেকে — মৃত্যুসনদ, ওয়ারিশদের এনআইডি/জন্মসনদসহ আবেদন করলে যাচাই করে সনদ দেওয়া হয় (অনেক জায়গায় অনলাইনেও)। জমির নামজারি, ব্যাংকের টাকা তোলা — সবখানে এটি লাগে।
মৃত্যুর আগে কি সব সম্পত্তি একজনকে লিখে দেওয়া যায়?
জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি দান (হেবা) করে রেজিস্ট্রি করে দেওয়ার অধিকার মালিকের আছে — দখলও বুঝিয়ে দিতে হয়। তবে উইলের (অসিয়ত) মাধ্যমে মুসলিম আইনে এক-তৃতীয়াংশের বেশি দেওয়া যায় না, এবং কোনো ওয়ারিশকে উইল করলে অন্য ওয়ারিশদের সম্মতি লাগে।
বণ্টননামা রেজিস্ট্রি করা কি বাধ্যতামূলক?
মৌখিক ভাগাভাগি বহু পরিবারে চলে, কিন্তু ঝুঁকিপূর্ণ। লিখিত বণ্টননামা (পার্টিশন দলিল) রেজিস্ট্রি করলে প্রত্যেকের অংশ আইনত চূড়ান্ত হয় — পরে নামজারি, বিক্রি ও বিরোধ এড়ানো সহজ হয়। সব ওয়ারিশ একমত না হলে আদালতে বাটোয়ারা মামলার পথ আছে।
হিন্দু উত্তরাধিকার কি মুসলিমদের মতোই?
না — বাংলাদেশে হিন্দুদের ক্ষেত্রে দায়ভাগা পদ্ধতি প্রযোজ্য; সেখানে ছেলে ও নির্দিষ্ট শ্রেণির উত্তরাধিকারীর নিয়ম আলাদা, মেয়েদের অধিকার সীমিত (নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে জীবনস্বত্ব)। খ্রিষ্টানদের ক্ষেত্রে সাকসেশন আইন, ১৯২৫ প্রযোজ্য — স্ত্রী এক-তৃতীয়াংশ, বাকি সন্তানদের মধ্যে সমান।
কোনো ওয়ারিশ বিদেশে — বণ্টন কি আটকে থাকবে?
না। প্রবাসী ওয়ারিশ দূতাবাসে সত্যায়িত আমমোক্তারনামার (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) মাধ্যমে দেশে প্রতিনিধি নিয়োগ করে বণ্টন, নামজারি বা বিক্রিতে অংশ নিতে পারেন। তার অজান্তে তাকে বাদ দিয়ে বণ্টন করলে তা পরে বাতিলযোগ্য।
উত্তরাধিকার হিসাব করার সহজ উপায় আছে?
আছে — 'উত্তরাধিকার' নামে সরকারি ক্যালকুলেটর অ্যাপ/ওয়েবসাইটে (ভূমি মন্ত্রণালয়ের) ওয়ারিশদের তথ্য দিলে ফারায়েজ অনুযায়ী ভাগ হিসাব করে দেয়। তবে জটিল পরিবার-কাঠামোয় (একাধিক বিয়ে, আগে-মৃত ওয়ারিশ) একজন আইনজীবী দিয়ে মিলিয়ে নেওয়া নিরাপদ।
তথ্যসূত্র ও আইনি রেফারেন্স
- মুসলিম ব্যক্তিগত আইন (শরিয়ত) প্রয়োগ আইন, ১৯৩৭
- সাকসেশন আইন, ১৯২৫
- জাতীয় আইনগত সহায়তা সংস্থা — ১৬৪৩০
আরও পড়ুন
লেখাটি শেয়ার করুন, লেখকের পরিচয় দেখুন এবং একই বিষয়ের আরও গাইড পড়ুন।
লেখকের পরিচিতি

লেখক
শান্ত ইসলাম
প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সম্পাদক · এলএল.বি — BAUET · এলএল.এম — BUP
শান্ত ইসলাম বাংলাদেশ আর্মি ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি (BAUET) থেকে এলএল.বি এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (BUP) থেকে এলএল.এম সম্পন্ন করেছেন। তিনি বাংলাদেশের আইন, সরকারি সেবা ও নাগরিক অধিকার নিয়ে সহজ বাংলায় লেখালেখি করেন — লক্ষ্য একটাই, জটিল আইনি বিষয়কে সাধারণ মানুষের কাছে বোধগম্য করে তোলা।
সম্পর্কিত
সম্পর্কিত লেখা
একই বিষয়ের দরকারি গাইড
নামজারি (মিউটেশন) করার নিয়ম: ই-নামজারির আবেদন, খরচ ও সময়
জমি কেনা বা ওয়ারিশসূত্রে পাওয়ার পর নামজারি কেন বাধ্যতামূলক — ই-নামজারির অনলাইন আবেদন, প্রয়োজনীয় কাগজ, সরকারি ফি ১,১৭০ টাকা, শুনানি ও খতিয়ান পাওয়ার পূর্ণ প্রক্রিয়া।
খতিয়ান ও পর্চা অনলাইনে তোলার নিয়ম — সিএস, এসএ, আরএস, বিএস কোনটা কী?
ঘরে বসে eporcha.gov.bd থেকে খতিয়ানের সার্টিফাইড কপি তোলার ধাপ, সিএস-এসএ-আরএস-বিএস খতিয়ানের পার্থক্য, ফি ও জমি কেনার আগে রেকর্ড যাচাইয়ের চেকলিস্ট।
জমিজমা নিয়ে ১০টি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর — নামজারি, খতিয়ান, দলিল
দলিল থাকলেই কি মালিক, নামজারি না করলে কী হয়, খতিয়ান কীভাবে দেখে, জমি কেনার আগে কী যাচাই করবেন — জমিজমার সবচেয়ে জিজ্ঞাসিত ১০ প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর।
সন্তান দত্তক ও অভিভাবকত্ব নিয়ে ১০টি প্রশ্নের উত্তর
বাংলাদেশে মুসলিমরা কি দত্তক নিতে পারেন, অভিভাবকত্বের আদালত-প্রক্রিয়া, তালাকের পর সন্তান কার কাছে, নাবালকের সম্পত্তি বিক্রি — অভিভাবকত্ব আইনের ১০ প্রশ্নের উত্তর।
হলফনামা, নোটারি ও আমমোক্তারনামা নিয়ে ১০টি প্রশ্নের উত্তর
হলফনামা কোথায় করে, নোটারি খরচ কত, কোন স্ট্যাম্পে কী লিখতে হয়, আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নি) কখন রেজিস্ট্রি লাগে, ভুয়া নোটারি চেনা — ১০ প্রশ্নের উত্তর।
চেক ডিজঅনার ও পাওনা টাকা আদায় নিয়ে ১০টি প্রশ্নের উত্তর
চেক বাউন্স করলে কত দিনের মধ্যে কী করতে হয়, লিগ্যাল নোটিশের নিয়ম, ধার দেওয়া টাকা ফেরত না পেলে মামলার পথ, ব্ল্যাংক চেকের ঝুঁকি — টাকা-পয়সার আইনি ১০ প্রশ্নের উত্তর।